ব্রুনাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি ছোট কিন্তু সম্পদশালী দেশ, যা তার তেল ও গ্যাস সম্পদের জন্য বিখ্যাত। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই উন্নত জীবন ও ভালো আয়ের সন্ধানে ব্রুনাইয়ে কাজের উদ্দেশ্যে যান।

২০২৫ সালে ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মীরা বিভিন্ন পেশায় কেমন বেতন পেতে পারেন, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে।

এই পোস্টে আমরা ব্রুনাইয়ের বেতন কাঠামো এবং বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মীদের সম্ভাব্য মাসিক আয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, পাশাপাশি বাংলাদেশি টাকায় সেই আয়ের পরিমাণও উল্লেখ করব।

ব্রুনাই বেতন কত

ব্রুনাইয়ে কর্মীদের বেতন মূলত নির্ভর করে তাদের কাজের ধরণ, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং নিয়োগকর্তা কোম্পানির নীতির উপর। ২০২৫ সালে ব্রুনাইয়ের গড় বেতন কত হতে পারে তা বলা কঠিন, তবে কিছু নির্দিষ্ট সেক্টরে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মীরা ভালো আয় করতে পারেন।

সাধারণভাবে, নির্মাণ, কৃষি, গৃহস্থালী কাজ এবং কিছু কারিগরি পেশায় কাজের সুযোগ বেশি থাকে। এসব ক্ষেত্রে মাসিক বেতন সাধারণত ৪০০ থেকে ৮০০ ব্রুনাই ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩৫,২০০ থেকে ৭০,৪০০ টাকা। তবে, দক্ষ কর্মীরা যেমন টেকনিশিয়ান, সুপারভাইজার বা বিশেষ পেশাদার পদে আরও বেশি বেতন পেতে পারেন।

ব্রুনাইয়ের নিজস্ব শ্রম আইন রয়েছে এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষিত। বেতন আলোচনার সময় কর্মীদের তাদের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা উচিত।

ব্রুনাই কোন কাজের চাহিদা বেশি

ব্রুনাইয়ের শ্রমবাজারে বর্তমানে কিছু নির্দিষ্ট সেক্টরে কর্মীর চাহিদা বেশি। এর মধ্যে অন্যতম হলো নির্মাণ খাত। এখানে রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ঢালাই কর্মী এবং অন্যান্য নির্মাণ শ্রমিকদের নিয়মিত প্রয়োজন হয়। এছাড়াও, কৃষি খাতে বিশেষ করে পাম তেল বাগান এবং অন্যান্য ফসল উৎপাদনে শ্রমিকদের চাহিদা থাকে।

গৃহস্থালী কাজের জন্য মহিলা কর্মীদের প্রয়োজন হয়, যেমন বাসা-বাড়ির তত্ত্বাবধান ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ। কিছু কারিগরি পেশা যেমন ওয়েল্ডিং, ইলেকট্রিশিয়ান এবং প্লাম্বিং এর কাজেও দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে যারা ব্রুনাইয়ে কাজের জন্য যেতে চান, তারা এই সেক্টরগুলোতে তাদের দক্ষতা অনুযায়ী চেষ্টা করতে পারেন।

বাংলাদেশ থেকে ব্রুনাই যেতে কত সময় লাগে

বাংলাদেশ থেকে ব্রুনাই সরাসরি কোনো ফ্লাইট নেই। সাধারণত, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে এক বা একাধিক ট্রানজিট নিয়ে ব্রুনাই যেতে হয়। এক্ষেত্রে মোট সময় লাগতে পারে ৫ থেকে ১০ ঘণ্টা বা তারও বেশি। ফ্লাইটের রুট এবং ট্রানজিটের সময়ের উপর নির্ভর করে এই সময় কম বা বেশি হতে পারে।

সাধারণত, ঢাকা থেকে যাত্রা করে প্রথমে কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) বা সিঙ্গাপুরের মতো কোনো একটি বিমানবন্দরে ট্রানজিট করতে হয়, এরপর সেখান থেকে ব্রুনাইয়ের রাজধানী বন্দর সেরি বেগাওয়ানে পৌঁছানো যায়।

ব্রুনাই যেতে কত টাকা লাগে

বাংলাদেশ থেকে ব্রুনাই যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ নির্ভর করে ভিসার ধরণ, ফ্লাইটের টিকিটের মূল্য এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের উপর। ওয়ার্ক ভিসার জন্য আবেদন করতে সাধারণত কিছু ফি লাগে। ফ্লাইটের টিকিটের দাম সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়, তবে সাধারণত ইকোনমি ক্লাসের টিকিটের দাম ৩০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে।

এছাড়াও, ব্রুনাইয়ে পৌঁছানোর পর প্রাথমিক খরচ যেমন থাকা-খাওয়ার জন্য কিছু টাকা প্রয়োজন হতে পারে। ভিসা প্রসেসিং, টিকিট ক্রয় এবং প্রাথমিক জীবনযাত্রার খরচ সহ, বাংলাদেশ থেকে ব্রুনাই যেতে সাধারণত ৫০,০০০ থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এক্ষেত্রে কোনো রিক্রুটিং এজেন্সির সাহায্য নিলে তাদের সার্ভিস চার্জও যোগ হতে পারে।

ব্রুনাই ফুড ডেলিভারি বেতন কত

ব্রুনাইয়ে ফুড ডেলিভারি একটি অপেক্ষাকৃত নতুন পেশা, তবে শহরাঞ্চলে এর চাহিদা বাড়ছে। বিভিন্ন অনলাইন ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এখানে কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ২০২৫ সালে ব্রুনাইয়ে একজন ফুড ডেলিভারি কর্মীর মাসিক বেতন সাধারণত ৩০০ থেকে ৬০০ ব্রুনাই ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৬,৪০০ থেকে ৫২,৮০০ টাকা।

এই বেতন মূলত নির্ভর করে কর্মীর কাজের সময়, ডেলিভারির সংখ্যা এবং গ্রাহকদের দেওয়া টিপসের উপর। যারা নিজস্ব পরিবহন (যেমন মোটরবাইক) ব্যবহার করে ডেলিভারি করেন, তাদের আয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। তবে, এই কাজের জন্য ব্রুনাইয়ের ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং স্থানীয় নিয়ম কানুন সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা প্রয়োজন। কিছু প্ল্যাটফর্ম কর্মীদেরকে নির্দিষ্ট দূরত্ব এবং ডেলিভারির সংখ্যার উপর ভিত্তি করে বোনাসও প্রদান করে থাকে।

আরও পড়ুন —

ব্রুনাই ড্রাইভিং ভিসা বেতন কত

ব্রুনাইয়ে ড্রাইভিং ভিসায় যারা যান, তাদের বেতন তারা কোন ধরনের যানবাহন চালান তার উপর নির্ভর করে। যেমন, বাস ড্রাইভার, লরি ড্রাইভার বা ব্যক্তিগত গাড়ি চালকের বেতনে ভিন্নতা দেখা যায়। ২০২৫ সালে একজন ড্রাইভিং ভিসায় যাওয়া কর্মীর মাসিক বেতন সাধারণত ৫০০ থেকে ১০০০ ব্রুনাই ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৪,০০০ থেকে ৮৮,০০০ টাকা।

বিশেষ করে যারা ভারী যানবাহন চালনায় অভিজ্ঞ এবং যাদের ব্রুনাইয়ের ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে, তারা আরও বেশি বেতন পেতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে, ড্রাইভারদের জন্য ওভারটাইম এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও যুক্ত থাকে, যা তাদের মোট আয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তোলে।

ড্রাইভিং ভিসার ক্ষেত্রে, ব্রুনাইয়ের ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকা আবশ্যক, যা বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিয়োগকর্তারা প্রায়শই কর্মীদের আবাসন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে থাকেন।

ব্রুনাইয়ে জীবনযাত্রার ব্যয়

ব্রুনাইয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলকভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য কিছু দেশের চেয়ে কিছুটা বেশি। থাকার খরচ নির্ভর করে শহরেরlocation এবং আবাসনের ধরনের উপর। অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া সাধারণত ৩০০ থেকে ৬০০ ব্রুনাই ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৬,৪০০ থেকে ৫২,৮০০ টাকা।

খাবার খরচ প্রতি মাসে প্রায় ২০০ থেকে ৪০০ ব্রুনাই ডলার লাগতে পারে, যা নির্ভর করে খাদ্যাভ্যাসের উপর। বাংলাদেশি টাকায় এই পরিমাণ প্রায় ১৭,৬০০ থেকে ৩৫,২০০ টাকা। পরিবহন খরচ তুলনামূলকভাবে কম, বিশেষ করে যারা গণপরিবহন ব্যবহার করেন। অন্যান্য ব্যক্তিগত খরচ যেমন পোশাক, মোবাইল রিচার্জ এবং বিনোদন বাবদও কিছু খরচ থাকে।

সাধারণভাবে, একজন কর্মীর মাসিক আয় থেকে কিছু অর্থ সঞ্চয় করা সম্ভব, যা তাদের জীবনযাত্রার ধরনের উপর নির্ভর করে।

ব্রুনাইয়ের কর্মসংস্কৃতি ও শ্রম আইন

ব্রুনাইয়ের কর্মসংস্কৃতি সাধারণত নিয়মতান্ত্রিক এবং সম্মানজনক। কর্মঘণ্টা সাধারণত সপ্তাহে ৪০ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে এবং কর্মীদের বাৎসরিক ছুটি ও অন্যান্য শ্রম আইন অনুযায়ী সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়। কর্মীদের অধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্রুনাইয়ের নিজস্ব শ্রম আইন রয়েছে।

নিয়োগকর্তা এবং কর্মীদের উভয়েরই এই আইন সম্পর্কে অবগত থাকা উচিত। কোনো সমস্যা হলে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগও রয়েছে।

উপসংহার

ব্রুনাই বাংলাদেশ থেকে কর্মীদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় কর্মস্থল হতে পারে। ২০২৫ সালে বিভিন্ন সেক্টরে কাজের সুযোগ এবং তুলনামূলকভাবে ভালো বেতন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, ব্রুনাইয়ের জীবনযাত্রার খরচ, সংস্কৃতি এবং স্থানীয় রীতিনীতি সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া উচিত।

কাজের জন্য যাওয়ার আগে অবশ্যই বৈধ পথে এবং সঠিক ভিসা নিয়ে যাত্রা করা উচিত। ভালোভাবে খোঁজ খবর নিয়ে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করলে ব্রুনাইয়ে একটি সুন্দর কর্মজীবন গড়ে তোলা সম্ভব। এই পোস্টে দেওয়া তথ্যগুলো একটি সাধারণ ধারণা দেওয়ার জন্য। প্রকৃত বেতন এবং সুযোগ সুবিধা কাজের ধরণ ও কোম্পানির উপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *